পিরিয়ড এবং স‍্যানিটারি ন‍্যাপকিন

পিরিয়ড এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন ।
                      পিরিয়ড নিয়ে বেশ কয়েক জনের পোস্ট আমি পড়েছি । আসলে আমাদের মধ্যে যাদের বয়স চল্লিশের বেশি তাদের সবার পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা প্রায় কাছাকাছি বলা চলে । কারণ, আমাদের সময়ে পিরিয়ড বিষয়টা ছিল খুবই গোপনীয় এবং স্পর্শকাতর একটি ব্যাপার । আমাদের সময়ে এখনকার মতো স্যানিটারি ন্যাপকিন সচরাচর এবং সহজলভ্য ছিল না । শহরে হয়তো পাওয়া যেত বড় বড় শপিং মল বা বড় বড় ফার্মেসিগুলোতে । গ্রামের মানুষের স্যানিটারি ন্যপাকিন সম্পর্কে তখন কোনো ধারণাই ছিল না ।
    আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন আমার পিরিয়ড শুরু হয় । ছোটবেলা থেকেই আমি বংশগতভাবে বেশ মোটাসোটা ছিলাম এবং এখনো আছি । বয়সের তুলনায় ওজন বেশি হওয়ায বোধহয় আমার পিরিয়ড খুব দ্রুতই শুরু হয়ে গিয়েছিল । পিরিয়ড চলাকালীন সময় আমার একমাত্র ভরসা ছিলো আমার মায়ের পুরনো শাড়ি এবং মাঝে মধ্যে আমার বাবার পুরনো লুঙ্গি । পুরো তেরো হাত লম্বা শাড়ির পুরোটা আমার মা কেঁচি দিয়ে কেটে সাত দিনের জন্য হিসেব করে ভাগ করে দিতেন । কারণ, প্রথম দিকে আমি ঘৃণায় রক্তে ভেজা ন্যাকরা গুলো নিজের হাতে ধুতে চাইতাম না । যার জন্য আমার মা আমার ব্যবহৃত ন্যাকরাগুলো একটা পলিথিনে মুড়িয়ে ঘরের পেছনের জঙ্গলে মাটিতে পুঁতে দিতেন । পরে অবশ্য ধীরে ধীরে আমার অভ্যাস পরিবর্তন করতে হয়েছিল । কারণ মায়ের পুরনো শাড়ি , দাদী, ফুপুদের পুরনো শাড়ি এবং বিছানার চাদর থেকে আমার বাবার পুরনো লুঙ্গি পর্যন্ত আমার কাছ থেকে রেহাই পেত না । আমার মা বাবার বাড়ি বেড়াতে গেলে নানীর শাড়ি পর্যন্ত সাথে করে নিয়ে আসতেন ।
আমার পরে ছোট দুই বোনের যখন পিরিয়ড শুরু হয়েছিল তখন তারা আমার মাকে কিছু বলেনি । দুজনেই আমার সাথে ওদের সমস্যা শেয়ার করেছিল ।
    আমার একটি মেয়ে । ওর যেদিন প্রথম পিরিয়ড শুরু হয় সেদিন ওর বাবা প্রথম ওকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে দিয়েছিল । যা আজও একই ভাবে চলছে । মেয়েকে বলেছিলাম যে, তোমার সব ধরনের সমস্যা আমার পাশাপাশি তোমার বাবার সাথে শেয়ার করবে । বাবার কাছে কখনো কোন বিষয়ে কথা বলতে লজ্জা বা ইতস্তত বোধ করবে না । আমার মেয়ে আমাকে হতাশ করেনি । এখনো সে অবলীলায় অসংকোচে ওর বাবার সাথে সব ধরনের বিষয় শেয়ার করে । পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগেই বাবাকে বলে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে নিয়ে আসতে ।
    মেয়ের পরে আমার তিন ছেলে । সবার বয়স পনেরোর নিচে। ওরা সবাই জানে পিরিয়ড মানে কি । মেয়ে ওর ভাইদের সাথে পিরিয়ড বিষয়টা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করে এই বিষয়ে ওদেরকে পজিটিভ একটা ধারণা দিয়েছে ।
আমার মেয়ে আমাকে বলেছিল, আম্মু আমার অস্বস্তি লাগে যখন আমার পিরিয়ড শুরু হয় । তখন আমার স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না । আমি স্কুলে যেতে না চাইলে ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করে আপু তুমি কেন স্কুলে যেতে চাচ্ছো না ? আমি ওদের সাথে মিথ্যে কথা বলতে চাই না । তাই ওদেরকে আমি আমার সমস্যার কথা বুঝিয়ে বলেছি ।
গত কয়েক দিন আগে সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় মেয়ে বলতেছে সে আজকে স্কুলে যাবে না । মেয়েটা প্রায় সময় স্কুলে যেতে চায় না আর ওর দেখাদেখি ছেলেগুলোও স্কুলে যেতে চায় না । তাই সেদিন আমি মেয়ের প্রতি রাগ দেখাচ্ছিলাম আর বলতেছিলাম আজকে তোমাকে স্কুলে যেতেই হবে । তখন আমার বড় ছেলেটা বলে আম্মু আপুর পিরিয়ড স্টার্ট হবে তাই আপু স্কুলে যেতে চাচ্ছে না আজকে । সমস্যা নাই আমরা স্কুলে যাচ্ছি । আপু বাসায় রেস্ট করুক আজকে ।
   আমি খেয়াল করে দেখেছি ওরা ওদের বোনের এই সমস্যাটাকে খুবই গুরুত্ব দেয় এবং বোনের প্রতি সেই সময়টাতে যত্নশীল হয় । আমি মনে মনে ভীষন গর্ব বোধ করি ওদের জন্য । ওরা এই বয়সেই নারীর প্রতি সম্মান দেখাতে শিখে গেছে । আমি আমার সন্তানদেরকে পিরিয়ড নিয়ে ভুল ধারণা জন্মানোর সুযোগ দেইনি । স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে আমার বরের ভুল ট্যাবু ছিল যা আমার মেয়ের মাধ্যমে দূর করতে সক্ষম হয়েছি আমি ।
  আমরা যারা অভিভাবক তাদের উচিত ছেলে মেয়েদের সাথে পিরিয়ড নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা । তাদের মনে নারী পুরুষের শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যগুলোর পরিবর্তন সহজ ভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করা ।
সবশেষে আমার নিজস্ব একটি মতামত আপনাদের সাথে শেয়ার করছি যা আমি সবসময় মাথায় রাখি । মনে রাখবেন যে যতো বড় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হোক না কেন, পারিবারিক শিক্ষার সমকক্ষ হিসেবে সেই শিক্ষাকে প্রাধান্য দেয়া যাবে না । সন্তান পরিবার থেকে যা কিছু অর্জন করে তা সে নিজের জীবনে গ্রহণ বা বর্জন করতে শিখে ।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *