বিদগ্ধ হৃদয়ের অভিলাষ
” বিদগ্ধ হৃদয়ের অভিলাষ “
১ম পর্ব
মহুয়ার ঘুমটা আজকেও ভেঙে গেল। প্রেগনেন্সির প্রায় চার মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। শরীরের ক্লান্তি অবসাদ দিন দিন যেন তীব্রতর হচ্ছে। ইদানীং রাত দুটোর পরে কেন জানি ঘুম ভেঙে যায়। এপাশ ওপাশ করে অনেক চেষ্টার পর কোন কোন দিন এক আধটু চোখের পাতা যদিও এক করতে পারে ,তবে পাশে শুয়ে থাকা মানুষটার ঘুমের ব্যাঘাত হবে ভেবে প্রায় রাতেই চোখ বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুম চলে আসে বুঝতেই পারে না মহুয়া ।
প্রতিদিনের মতো আজকে ঘুমটা ভেঙে গেলে পাশ ফিরে দেখে শাফিন বিছানায় নেই। বোধহয় বাথরুমে গেছে ভেবে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগল মহুয়া । হঠাৎ পাশের রুম থেকে শাফিনের চাপা হাসি আর ফিসফিস করে কথা বলার মৃদু আওয়াজ কানে আসতেই মহুয়া অবাক হয়ে যায়। এতো রাতে শাফিন কার সাথে কথা বলছে? ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে পাশের রুমের দিকে এগুতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পরে মহুয়া।পা দুটো যেন পাথরের মতো ভারী মনে হচ্ছে ওর কাছে। চট্ করে ডাইনিং টেবিলের কোণাটা ধরে নিজেকে সামলে নেয় সে। কিছুক্ষণ স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সে!
শাফিন একটা মেয়ের সাথে ফিসফিস করে সেক্সুয়্যাল কথাবার্তা বলছে!বুঝাই যাচ্ছে মেয়েটি ওর পরিচিত কেউ। কতক্ষণ একই ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল খেয়াল নেই মহুয়ার। আস্তে আস্তে হেঁটে শাফিনের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায় সে।মহুয়াকে দেখে যেন ভূত দেখার মতোই চমকে উঠে শাফিন। ফ্যাকাশে মুখে হাসি টেনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতে থাকে।
‘ খুব তো মজা করে কথা বলতে পার তুমি। কই আমার সাথে তো কখনও এতো রোমান্টিক ভাবে কথাবার্তা বলনি! নাকি ঘরের বৌ একদম গ্যারান্টেড ভেবে নিয়েছ? বিছানায় যতক্ষণ থাকব ততক্ষণ তোমার প্রয়োজনের বৌ ! আর বাকি সময়টা তোমার ঘরের দাসী! এটাই তো মনে কর তুমি আমাকে, তাই না?’
ভারী গলায় কথাগুলো বলে উত্তরের অপেক্ষা না করেই ঝট করে ঘুরে নিজের রুমে চলে আসে মহুয়া।কষ্টে ভেতরটা দুমড়ে মোচড়ে যাচ্ছে ওর। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতো বড় ধোঁকা?যে মানুষটাকে সে পাগলের মতো ভালোবাসে এই কি সেই মানুষটা ? দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পরে তপ্ত পানির ফোটা।
শাফিন সাথে সাথেই রুমে এসে পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য মহুয়াকে জড়িয়ে ধরে কপালে গালে ঠোঁটে চুমু খায়। চোখের পানি মুছে দেয়।
‘ দূর পাগলী! এই সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এতো মন খারাপ করতে হয় নাকি ? আমি তো এমনি এমনি আমার ফেইসবুকের ফ্রেন্ড লিস্টের একটা মেয়ের সাথে মেসেন্জারে ফাউ মজা করছিলাম । আমি কি সত্যি সত্যিই ঐ মেয়ের সাথে শুয়েছি নাকি? তাছাড়া পুরুষ মানুষ তো এমন দুই চারটে মজা করতেই পারে! ‘
হাসতে হাসতেই কথাগুলো বলল শাফিন। মহুয়া এক দৃষ্টিতে থাকিয়ে থাকে শাফিনের দিকে। মনে মনে বলে ‘আমি জানি শাফিন তুমি মিথ্যে কথা বলছ। আমি যা বুঝার বুঝে গেছি। ‘
মহুয়ার দৃষ্টিতে কি যেন ছিল যা শাফিনের রীতিমত অস্বস্তি লাগছিল। তাই চোখ নামিয়ে নেয় সে। বাকি
রাতটা দু’জন বিছানার দুই প্রান্তে ছটফট করে কাটিয়ে দেয়। সকালে নাস্তা না করেই শাফিন বেড়িয়ে যায়। আজকে অফিসেই নাস্তা সেরে নেবে। মহুয়াও বিছানা থেকে উঠেনি। সারা রাতের ক্লান্তি ওকে অসার করে দিয়েছে। দুপুর পর্যন্ত বিছানাতেই শুয়ে থাকে সে।
বিকেলের দিকে পেটের ভেতর ক্ষুধা যেন হিসহিস করে উঠে। কোনরকমে বিছানা থেকে উঠে শাওয়ার সেরে ড্রেসিং টেবিলটার সামনে এসে দাঁড়ায় মহুয়া । প্রচন্ড ক্ষুধার কথা ভুলে আয়নাটার খুব কাছে এসে নিজেকে আজ এপাশ ওপাশ ঘুরিয়ে দেখতে লাগল সে । চুলে খুশকিতে ভরে গেছে। সারা মুখে পিম্পলের দাগ কালো হয়ে আছে। ওজন অনেক বেড়ে গেছে। আজকে আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেরই ঘেন্না লাগছে ওর। দেখতে সে আহামরি সুন্দরী না। খুবই সাধারণ চেহারার মেয়ে সে। তাছাড়া প্রেগনেন্ট হবার পর থেকে নিজেকে নিয়ে ভাবার সময়ই পায়নি সে। সারাদিন বমি বমি ভাব, খাবারে অরুচি । সাবান শ্যাম্পু, টুথপেস্ট ,পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, মাংস, তেলের গন্ধ কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না সে। কতদিন হলো চুলে চিরুনি লাগানো হয়নি। চিরুনিটা নিয়ে ধীরে ধীরে চুলের জট খুলতে থাকে মহুয়া।
অশান্ত মনে কতো রকমের প্রশ্ন যে জমা হতে থাকে ওর। ওদের বিয়ের দুই বছর হয়ে গেছে। বিয়ের পর থেকে শাফিনের চোখে নিজেকে আকর্ষনীয় করে উপস্থাপনের জন্য ,শাফিনের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কতো চেষ্টাই না করেছে সে। সংসারের নানা রকম কাজের মধ্যে ব্যস্ত থেকেও সবসময় নিজেকে পরিপাটি করে রাখতে পছন্দ করত মহুয়া। এরেন্জ ম্যারেজ ওদের। তবে এটা নিয়ে কোন আক্ষেপ ছিল না ওর। কারণ, শাফিনের ব্যক্তিত্ব, সৌন্দর্য, যোগ্যতা ওকে মুগ্ধ করেছিল। শাফিনের মতো বর যে কোন মেয়েরই কাম্য বলেই মনে করতো সে।
চলবে—-।
